বাক্ড়ী বহুমূখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়

By নভেম্বর ১৪, ২০১৪ নভেম্বর ১৫, ২০১৯ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

এগারখান অঞ্চলের তৎকালিন অজ পাড়াগাঁয়ের বাকড়ীতে গড়ে উঠা স্কুলটির ইতিহাস রচনা করা সুকঠিন বিষয় বৈকি । এ বিষয়ে তেমন কোন লিখিত তথ্য নাই বললেই চলে-যার সাহায্য নেওয়া যায় ।

বাকড়ীতে ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বে কোন পাঠশালা স্থাপিত হয় নাই । ঐ সময়ের অব্যবহিত পূর্বে উক্ত গ্রামের বিহারী রায়ের সহ-ধর্মিনী স্বর্গীয় স্বর্ণময়ী রায় দু‌‌‌’একটি ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতেন ।ইনি ছিলেন মালিয়াট গ্রামের মেয়ে । সেখানকার বালিকা বিদ্যালয় থেকে তিনি কিছুটা লেখা পড়া শিখেছিলেন ।
বাকড়ী গ্রামের অম্বিকাচরণ মজুমদার তাঁর জুবা বয়সে নিজ গ্রামের কোমল মুখার্জীর পিতা রজনীকান্ত মুখার্জীর কাছে নৈশ অধ্যয়ন করে কিছুটা লেখাপড়া শিখেছিলেন । কিন্তু রজনী ঠাকুর কোথা থেকে লেখাপড়া শিখেছিলেন তার হদিস মেলে না । যাই হোক অম্বিকাচরণ অল্প বিদ্যা সম্বল করে ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দে নিজ গ্রামের রমাকান্তের বাড়িতে একটি পাঠশালা স্থাপন করেন । অল্প কয়েক জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয় তার পাঠশালা । এটিই বাকড়ী গ্রামের প্রথম পাঠশালা ।
অম্বিকাচরণ অল্পকাল পর সীতা নাথ বিশ্বাসের উপর পাঠশালার ভার দেন কারণ তাকে কবি গান করার জন্য এখানে ওখানে যেতে হত । সীতানাথ বিশ্বাস বেশি দিন পাঠশালা চালাননি । অল্পকাল পরে দোগাছি গ্রামের রাজেন্দ্রনাথ গোলদার বাকড়ীর বটতলে পাঠশালা স্থাপন করেন । তখন পাঠশালার জন্য কোন ঘর ওঠেনি । খোলা জায়গায় পাঠশালা বসতো । এটা হলো ১৯২২ খ্রীষ্টাব্দের কথা ।
অল্পকালের মধ্যে জনগনের উদ্যেগে এক খানি খড়ো ঘর উঠলো কিন্তু গোলদার মশাই বাকড়ী ছেড়ে নিজ গ্রামে গিয়ে পাঠশালা স্থাপন করলেন ।
অল্পকাল বিরতীর পর বাকড়ীর পাঠশালা আবার চালু হলো । এখানে যারা শিক্ষকতা করেছিলেন , পর্যায়ক্রমে তাদের নাম হলো – ১) হৃদয় নাথ মল্লিক ২) অবিনাশ চন্দ্র গোলদার ৩) ভরত চন্দ্র ভৌমিক ৪) অখিল চন্দ্র পাল ৫) নিমচাঁদ ঘোষ ও ৬) হরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস ।
নিমচাঁদ ঘোষ পূর্বে মালিয়াট বালিকা বিদ্যালয়ে ছিলেন । পরে বাকড়ীতে আসেন । শিক্ষকতা করা নিয়ে তার সাথে হরেণ বাবুর তুমুল দ্বন্দ্ব বাঁধে । গ্রামবাসী দু’দলে ভাগ হয়ে যায় । শেস পর্যন্ত দুই দলে মারামারিও হয়ে যায় । এ কলহের পরও হরেন বাবু টিকে থাকেন । উক্ত শিক্ষকগণের কার্যকাল ছিল আট বছর – ১৯২২ থেকে ১৯২৯ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত । তার পরে হয় নতুন অধ্যয়ের সূচনা।

১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে মালিয়াট বালক বিদ্যালয়ে এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে । ঐ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সাথে বেতনাদি সংক্রান্ত ব্যাপারে শিক্ষকগণের মনমালিণ্যের সৃষ্টি হয় । ক্রমে তা জটিল আকার ধারণ করে । এর চরম পর্যায়ে ম্যানেজিং কমিটি জবরদস্তি করেই কয়েকজন শিক্ষক এর কাছ থেকে পদত্যাগ পত্র লিখিয়ে নেন । ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে ঐ শিক্ষকগন স্কুল স্থাপনের উদ্দেশ্যে মালিয়াট ছেড়ে বাকড়ীতে চলে আসেন । যে শিক্ষকগণ এসেছিলেন তাদের নাম হলো – ১) জীবন গোপাল গুপ্ত ২) ভরত চন্দ্র পাঠক ৩) রাজেন্দ্র নাথ শিকদার ৪) সন্তোষ কুমার পাঠক ৫) রাজেন্দ্র নাথ পাল ।
যে পাঁচজন শিক্ষক এসেছিলেন, তাঁরা একজন করে ছাত্র সংঙ্গে এনেছিলেন । প্রত্যেকে এক টাকা করে দিয়ে তারা গুয়াখোলা গ্রাম থেকে পাঁচ টাকা মূল্যে একখানি ঘর কিনে বাকড়ীতে তুললেন এবং পাঠশালা চালু করলেন । অল্প দিনের মধ্যে বিদ্যালয়টি মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ে পরিণত হলো এবং সরকারী অনুমোদন লাভ করল । পরবর্তী কারে  ১৯৩৫ সাল নাগাত আরো দুটি শ্রেণি খোলা হলো । এই সময়ে বাইরে থেকে অনেক ছাত্র আসতে আরম্ভ করল ।
সেই সময়ে ঐ শিক্ষকগণ প্রায় বিনা বেতনে শিক্ষতা করতেন । শিক্ষকগণ তখন ছিলেন গুরুদেবের আদর্শে অনুপ্রাণিত নিঃস্বার্থ সমাজ কর্মী । এ গুরুদেব সম্বন্ধে দু’একটি কথা না বললেই নয় । ইনি ছিলেন মালিয়াট গ্রামের আনন্দ মোহন মিশ্রের ছেলে রাস মোহন মিশ্র । ইনি ১২৭৯ বঙ্গাব্দে আহ্লাদিনী দেবীর গর্ভে রাস পূর্ণিমা তিথিতে জন্ম গ্রহণ করেন । তাঁর সংক্ষিপ্ত নাম ছিল রাসু । পরে সবাই তাকে পন্ডিত মশাই বলে জানতেন । তাঁরই একান্ত চেষ্টায় এই এগারখান অঞ্চলে শিক্ষার আলোক বর্তিকা প্রজ্জ্বলিত হয় ।
বাকড়ী স্কুলের শিক্ষকগণ, পরিচালকমন্ডলী ও পৃষ্ঠপোষকগণের কথা হলো স্কুলকে আরো উন্নত করতে হবে । কিন্তু উন্নত করতে হলে জমির দরকার ।
এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছিলেন বাকড়ী গ্রামের মোহন লাল বিশ্বাস মহাশয় । তিনি জমি দান করে সমস্যার সমাধান করে দিলেন। স্কুল প্রতিষ্ঠার আর কোন বাঁধা রইল না । সেই থেকে তিনি দাতা হিসাবে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির একজন স্থায়ী সদস্য হয়েছিলেন । এই সময়ের একটি গানের কলি –                                                       শক্তি দিল শক্তি বাবু
মোহন দিল ঠাই
বঞ্চিতদের মেরুদণ্ড
খাড়া হলো তাই ।।
১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দ থেকে হাই স্কুল হবার পূর্ব পর্যন্ত যারা প্রধান শিক্ষেকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, পর্যায়ক্রমে তাদের নাম হলো :
১) জীবন গোপাল গুপ্ত –বিএ প্রাকট
২) শক্তি রঞ্জন বসু – বিএ
৩) জগজ্জিৎ সরকার – এম এ (ডবল)
৪) সুরেন্দ্র নাথ অধিকারী – বিএ
৬) ভবেন্দ্র নাথ বিশ্বাস – বিএ বিটি ।
এদের কার্যকাল ছিল ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৪ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত – দশ বছর । ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দে যথাক্রমে ৯ম ও ১০ম শেণি খোলা হয় । ১৯৪৭ সাল থেকে বাকড়ী স্কুল মঞ্জুরী লাভ করে এবং ঐ সালে প্রথম ব্যাচ পরীক্ষা দেয় । এ সময়টা ছিল উত্তেজনাপূর্ণ দেশ গ্লানিময় অমানিশা অবসানে পূর্ব দিগন্তে ফুটে উঠেছিল নব সূর্যের আভা । চারিদিকে এক রব “ ভারত ছাড়”।
১৯৫২ সাল থেকে চলে ভাঙ্গন । এই ভাঙ্গনের যুগ চলে বছর পাঁচেক ধরে। এই সময়ে বাকড়ী গ্রামের মনীন্দ্রনাথ হালদার ও গকুল চন্দ্র বিশ্বাস তার দু’একজন সহকর্মী নিয়ে এই নিমজ্জমান প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়ে একে টিকিয়ে রাখেন । তখন ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত কোন রকমে চালু ছিল ।
তার পর ১৯৫৭ সাল থেকে এলেন সুশীল কুমার পাঠক – বিএ ডি-ইন-এড । মুমূর্ষু শিক্ষায়তন পুনর্জীবিত হলো । সুশীল বাবু প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করে নবোদ্যমে কার্যারম্ভ করেন  । আবার অনুমোদন লাভ করে বাকড়ী হাইস্কুল । সুশীল বাবু ছয় বছর প্রধান শিক্ষক পদে নিযুক্ত ছিলেন । পরে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন ধর্মদাস বাবু ।

Leave a Reply